Headline :
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার সিদ্ধান্ত অগণতান্ত্রিক- মো. বাবুল হোসেন দেশে আরও বাড়ল পেট্রোল, অকটেন ও কেরোসিনের দাম সিংড়ায় ট্রাকচাপায় মোটরসাইকেলের দুই আরোহী নিহত চাকরির নামে টাকা হাতানোর ফাঁদ, সতর্ক করল এনবিআর ঈদের ছুটি শেষে সোমবার খুলছে অফিস-আদালত এবার আসিফ-হাসনাতকে চ্যালেঞ্জ করলেন কুমিল্লা জেলা পরিষদ প্রশাসক শার্শার গোগা সীমান্ত এলাকায় বিজিবির অভিযানে ২৫ বোতল ভারতীয় নেশা জাতীয় সিরাপ উদ্ধার  শোলাকিয়ায় ঈদের নামাজের নিরাপত্তায় দুই প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন ঈদে আইস্ক্রিনসহ বিভিন্ন ওটিটিতে যত আলোচিত সিনেমা যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ভারত যা চায়, তা-ই পাবে : ট্রাম্প

নিজাম উদ্দিন ভেঙেছেন অনিয়মের সব রেকর্ড

Reporter Name / ১৭৩ Time View
Update Time : বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬, ০১:৩৪ পূর্বাহ্ন

নিজস্ব প্রতিবেদক,

ভোলার চরফ্যাসনের চরমাদ্রাজ ফাজিল ডিগ্রি মাদ্রাসার বর্তমান অধ্যক্ষ নিজাম উদ্দিন ওরফে হুমায়ুন সরমান। অথচ শিক্ষাগত যোগ্যতা অনুযায়ী তিনি কৃষি শিক্ষক হওয়ারও যোগ্যতা ছিলেন না। জাল সনদ, ভুয়া নথিপত্র দেখিয়ে এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের স্বাক্ষর জাল করে অধ্যক্ষের পদ দখলে নিয়েছেন। এমনকি পদ দখল নিতে জীবিত অধ্যক্ষকে মৃত দেখিয়েছেন। তার অনিয়ম, ছলচাতুরীর এখানেই শেষ নয়, নিয়োগ বাণিজ্য, অর্থ আত্মসাৎসহ আরও নানা দুর্নীতিতে জড়িত হওয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের তদন্ত এবং বিশদ অনুসন্ধানে নিজাম উদ্দিনের জালিয়াতির এসব তথ্য উঠে এসেছে।

নথিপত্র বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ডিপ্লোমা ছাড়াই জালিয়াতির মাধ্যমে কৃষি শিক্ষক হন নিজাম উদ্দিন। এরপর শিক্ষক নিবন্ধন সনদ না থাকা সত্ত্বেও তিনি প্রভাষক বনে যান। এখানেই তিনি থামেননি। অধ্যক্ষ হতে দায়িত্বরত জীবিত অধ্যক্ষকে তিনি মৃত দেখিয়েছেন। এ পদে বসতে পরিচালনা কমিটির ভুয়া রেজুলেশন তৈরি করে সভাপতির স্বাক্ষর জাল করেছেন।

মাদ্রাসা সূত্র বলছে, মোটা অঙ্কের আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে অধ্যক্ষ পদ বাগিয়েছেন নিজাম উদ্দিন। স্থানীয় পর্যায়ে তো আছেই, মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদেরও দিয়েছেন বড় অঙ্কের টাকা। আওয়ামী ওলামা লীগের ক্ষমতার অপব্যবহার করে মাদ্রাসাকে বানিয়েছেন অনিয়ম ও দুর্নীতির স্বর্গ-রাজ্য। বিপুল অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে নিয়োগ দিয়েছেন বেশ কয়েকজন শিক্ষক-কর্মচারী। কোনো প্রকার নিয়ম-নীতি ছাড়াই নিজের ব্যক্তিগত মতামতকে প্রাধান্য দিয়ে প্রতিষ্ঠান পরিচালনার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

নিজাম উদ্দিনের অনিয়ম ও প্রতারণার বিষয়টি জানাজানি হলে তদন্ত শুরু করে মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তর। তদন্তে তার জালিয়াতির প্রমাণ মেলে। এসব জাল-জালিয়াতির বিষয়ে ব্যাখ্যা তলব করে ২০২৩ সালের ১২ সেপ্টেম্বর অধিদপ্তর থেকে নিজাম উদ্দিনকে চিঠি দেওয়া হয়; কিন্তু সাত কর্মদিবসের মধ্যে সশরীরে উপস্থিত হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হলেও অদৃশ্য কারণে এ প্রক্রিয়া থেমে যায়। আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

নিজাম উদ্দিনের জালিয়াতির ফিরিস্তি: নিয়ম অনুযায়ী, কৃষি শিক্ষক হওয়ার জন্য ‘কৃষি ডিপ্লোমা’ আবশ্যক। সেটি না থাকায় ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে পূর্ব ওমরাবাজ লুৎফুন্নেসা মহিলা আলিম মাদ্রাসার কৃষি শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন নিজাম উদ্দিন। সেজন্য ভুয়া নিয়োগ কমিটির কাগজ তৈরি করেন। ‘২০১৯২৪১’ এই ইনডেস্ক নম্বর ব্যবহার করে ২০০৪ সাল থেকে তিনি ওই মাদ্রাসায় শিক্ষকতা শুরু করেন। এরপর নিবন্ধন ছাড়াই হয়ে যান প্রভাষক। এক্ষেত্রে কৃষি শিক্ষকের একই ইনডেক্স ব্যবহার করেন, যা অধিদপ্তরের তদন্তে উঠে এসেছে।

নিজাম উদ্দিনের শিক্ষাগত যোগ্যতা, জীবনবৃত্তান্ত ও অন্যান্য নথিপত্র বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০০৪ সালে লুৎফুন্নেসা মহিলা আলিম মাদ্রাসার কৃষি শিক্ষক হওয়ার পর ২০০৬ সালের ৬ আগস্ট চরমাদ্রাজ ফাজিল মাদ্রাসায় কৃষি শিক্ষক পদে যোগদান করেন। একই বিষয়ের ওপর তিনি ২০১৫ সাল পর্যন্ত শিক্ষকতা করেন। অর্থাৎ এমপিওভুক্তির নথি অনুযায়ী তিনি ২০১৫ সাল পর্যন্ত কৃষি শিক্ষক ছিলেন। ২০০৫ সালের শিক্ষক নিবন্ধন বিধি অনুযায়ী প্রভাষক হিসেবে নিয়োগ পেতে হলে অবশ্যই নিবন্ধনধারী হতে হবে; কিন্তু ভুয়া নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেখিয়ে প্রভাষক পদে অবৈধভাবে নিয়োগ নেন।

এরপর অধ্যক্ষ হওয়ার জন্য ভয়ংকর প্রতারণার আশ্রয় নেন নিজাম উদ্দিন। চাকরি বিধিমালা অনুযায়ী অধ্যক্ষ হওয়ার জন্য যে শর্ত কিংবা যোগ্যতা আবশ্যক, এর কোনোটিই ছিল না তার। অধিদপ্তরের ২০১৮ সালের নীতিমালা অনুযায়ী, অধ্যক্ষ হতে প্রভাষক পদে ১২ বছর এবং সহকারী অধ্যাপক পদে ৩ বছর চাকরির অভিজ্ঞতা প্রয়োজন; কিন্তু সেই যোগ্যতা না থাকায় নতুন ফন্দি আঁটেন তিনি। আগের অধ্যক্ষ বহাল থাকলেও তাকে মৃত দেখিয়ে ২০১৬ সাল থেকে অধ্যক্ষ পদে যোগদান দেখান। অথচ তখন প্রভাষক হিসেবে তার চাকরির অভিজ্ঞতা মাত্র ১ বছর। সে হিসাবে ৩ বছর সহকারী অধ্যাপকের অভিজ্ঞতা থাকার কোনো সুযোগই ছিল না।

এ নিয়ে সমালোচনা শুরু হলে জ্যেষ্ঠ সহকারী অধ্যাপক মাওলানা মো. ইদ্রিসকে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব দেয় ম্যানেজিং কমিটি। অর্থাৎ ২০১৬ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত মাদ্রাসাটিতে ভুয়া নথিপত্র অনুযায়ী অধ্যক্ষ হিসেবে আছেন নিজাম উদ্দিন। অথচ ২০২১ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন মেয়াদে অধ্যক্ষ হিসেবে এ টি এম আবদুর রউফ এবং ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবে সহকারী অধ্যাপক মাওলানা মো. ইদ্রিস এবং নিজাম উদ্দিন নিজে দায়িত্ব পালন করেছেন। বিভিন্ন মেয়াদে তারা দায়িত্ব পালন করলেও সব সময়ই ছিল দুজন অধ্যক্ষ। নজিরবিহীন এ ঘটনা কেউ সে সময় যাচাই করে দেখেনি।

জানতে চাইলে মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক জাকির হোসাইন কালবেলাকে বলেন, প্রাথমিক তদন্তে জালিয়াতির প্রমাণ পাওয়া গেছে। অভিযুক্তকে গত বছর চিঠি দেওয়া হয়েছে; কিন্তু তিনি উপস্থিত হননি। এখন পর্যন্ত তার কোনো যথাযথ কাগজপত্রও আমরা পাইনি। আমরা ফের তাকে সশরীরে উপস্থিত হওয়ার জন্য চিঠি দিয়েছি। তিনি যদি উপস্থিত না হন কিংবা যথাযথ কাগজপত্র দেখাতে না পারেন, তাহলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তবে অধিদপ্তরের চিঠি পেয়ে উপস্থিত হয়েছিলেন বলে দাবি করেছেন অভিযুক্ত নিজাম উদ্দিন। তিনি কালবেলাকে বলেন, তারা কেন এটি স্বীকার করছেন না, তা জানি না। পুনরায় কেন উপস্থিত হতে বলল তাও জানি না। অভিযোগগুলোর বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এগুলো সব মিথ্যা অভিযোগ। আমার যখন যেই পদে যাওয়ার কথা ছিল, আমি সেখানেই গিয়েছি। কোনো মিথ্যা তথ্য কোথাও ব্যবহার করিনি।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *